Image

Image

1

ঘরের ছালার উপর আম গাছটায় একটা কাক ক্রমশ ডেকেই যাচ্ছে। এই অসহ্য শব্দে রাহেলার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো ভোর ৫.৩০ বাজে। এখনো ভালোভাবে ভোরের আলো ফোটেনি। এতো ভোরে কাক ডাকার কথা না তাও কাকটা একটানা ডেকেই যাচ্ছে। উঠতে গিয়ে টের পেলো মতিনের একটা হাত এখনো তার বুকের উপর। হাত সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে রাহেলা কাকটা তাড়ানোর জন্য চলে গেলো। এতো ভোরে ঘরের উপর কাক ডাকা মোটেও ভালো লক্ষন না। গোশল সেরে রাহেলাকে রান্না বসাতে হবে। সে একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। প্রত্যেকদিন তাকে এই সময়েই জাগতে হয়। সকালের রান্না করে স্বামী সন্তানকে খাইয়ে নিজের দুপুরের খাবার সাথে নিয়েই তাকে কাজে যেতে হয়। আজকের দিনের শুরুটাই ভালোভাবে হয়নি। ভোর বেলার কাকের ডাকটা তার মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। মনে মনে সে ধরেই নিয়েছে যে তার জন্য আজকে নিশ্চয় কোন খারাপ সংবাদ আছে।
rahela, choto golpo


সকালে কাক ডাকলে যে অমঙ্গল হয় তার প্রমান ও রাহেলার কাছে আছে। তার পাশের বাড়ীর এক চাচী এরকম এক সকালে ঘরের চালার উপর কাক ডাকতে দেখেছিলো। সেদিন ওই মহিলার বড় ছেলে এক্সিডেন্ট এ মারা যায়।
রাহেলার নানীর মুখে শোনা কাহিনীটা আরো ভয়ংকর। রাহেলার নানী যখন তার বয়সী ছিলো তখন একদিন সকালে চোখের সামনে দুটো কাঁককে ঝগড়া করতে দেখেছিল, আর সেদিনই উনার মা মারা গিয়েছে।
ভাতের পাতিলের গরম ছ্যাকা লাগতেই রাহেলা স্তম্বিত ফিরে পেলো। মতিনকে ডেকে তুলতে গিয়ে দেখলো তাদের ৪ বছরের ছোট্ট বাবুটাও জেগে উঠেছে।
একটু স্বচ্ছলভাবে চলার আশায় আরো ৬ বছর আগে মা, বাবা আর ছোট ছোট ভাইবোনদেরকে গ্রামে রেখে এই অজানার উদ্দ্যেশ্য এসেছিল রাহেলা। নতুন এবং কাজের অভিজ্ঞতা নেই এই অজুহাতে রাহেলাকে বেশ কিছুদিন কয়েকটি ফ্যাক্টরির গেটে গেটে ঘুরতে হয়েছিল। অবশেষে একদিন একটা ফ্যাক্টরিতে চাকরী হয়েছিল তার। কাজে যোগ দেওয়ার পর সে বুজেছিল কেন কাজ না জানা স্বর্তে তার চাকরী হয়েছিল। প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করার চেয়ে ও বড় কষ্টের ও অপমানের বিষয় ছিলো নির্যাতন। সুপারভাইজর সময় সুযোগ পেলেই গায়ের এখানে ওখানে হাত দিতো। প্রতিবাদ করাতে কাজের ছুতো ধরে যাচ্ছতাই গালিগালাজ করে কাজ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকী দিয়েছিলো। জগত সংসারের এমন নিষ্ঠুরতায় ব্যাথিত হয়ে রাহেলা একবার ভেবেছিলো চাকরী ছেড়ে দিবে। কিন্তু পরক্ষনেই অভাবী মা, বাবা আর ছোট ছোট ভাইবোনদের অনাহারে, অর্ধাহারে থাকা শুকনো মুখগুলো ভেসে উঠলো। চাকরী ছেড়েই বা কি করবে! নতুন চাকরী তাই কারো কাছে বলার সাহস ও পেলো না।

আসা যাওয়ার পথে পরিচয় হয়েছিল একই গার্মেন্টসের অপারেটর মতিনের সাথে। গল্পে গল্পে জানতে পেরেছিলো, ছোট বেলায় মতিনের মা, বাবা দুজনেই মারা যায়। ও বড় হয়েছিলো ওর নানীর কাছে। ১৪ বছর বয়সে নানী ও মারা যায়।  এই অনাথ এতীম ছেলেটার প্রতি রাহেলার মমতা জন্ম দেরী হয়নি। মতিনের সরলতা তার হৃদয়কে আরো বেশী ছুয়েছিল। একদিন সে মতিনের কাছে সুপারভাইজরের ঘটনা বললো। সেদিনেই মতিন সহ রাহেলা ওয়েলফেয়ারের ম্যাডামের কাছে গিয়ে সব খুলে বললো। তারপর থেকে রাহেলাকে আর এরকম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়নি।  তবে সুপারভাইজরের বদ নজরে পড়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চাকরী হারাতে হয়েছিলো মতিনকে। কাজ জানা থাকলে চাকরীর অভাব হয়না এই শ্বান্তনা দিয়ে মতিন রাহেলার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলো। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে পাশের আরেকটা ফ্যাক্টরিতে চাকরী নিয়েছিলো। মতিন চলে যাওয়ার পর রাহেলার মনের মমতা ও আবেগ আরো বেড়ে গেলো। দুজন দুই ফ্যক্টরিতে কাজ করলেও তাদের আসা যাওয়ার পথে দেখা হত। মতিন ও যে রাহেলাকে মনে মনে পছন্দ করতো সেটা রাহেলা বুঝতে পেরেছে। ১৪ই ফেব্রুয়ারির দিন যখন মতিন ১০টি গোলাপ হাতে নিয়ে এসে রাহেলাকে তার ভালোলাগার কথা জানিয়েছিলো সেদিন রাহেলা আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলো। ওই বছরের এপ্রিলেই তারা বিয়ে করেছে। ১ বছরের মাথায় রাহেলার নারী জীবন সার্থক করে এবং ঘর আলো করে পুত্র সন্তান আসলো।

বাচ্ছা হওয়ার আগে পরে রাহেলা ছয়মাস চাকরী ছেড়ে বাসায় ছিলো। বাচ্ছার ৪ মাস বয়স থেকে রাহেলা আবার কাজে যোগ দিলো। স্বামী, সন্তান আর কাজ সব মিলিয়ে রাহেলা যেন ক্রমেই হাঁপিয়ে উঠছিলো।
আমাদের দেশে নারীদের ঘরের বাহিরে এসে কাজ করা কত কঠিন তার পুরোটাই উপলব্ধি করতে পারে রাহেলারা।
কাজে যাওয়ার পথে চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটের নানা কটুক্তি, শরীর নিয়ে নানা বাজে মন্তব্য, কর্মক্ষেত্রে মানষিক নির্যাতন, ঘরে মাঝে মাঝেই স্বামী নামক পুরুষের নির্যাতন তাকে সহ্য করতে হয়।  জগতে মনে হয় সে একাই সব দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। সকালে উঠে রান্না করা তার কাজ, স্বামী সন্তানকে সময়মতো খাওয়ানো তার কাজ। সময়মতো কাজে যাওয়া, অর্পিত সব দায়িত্ব সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া তার কাজ। ১২-১৪ ঘন্টা কাজ শেষে বাসায় ফিরে আবার রান্না করা তার কাজ। স্বামী সন্তানকে ঠিক মত খেতে দেওয়া তার কাজ। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ মন নিয়ে স্বামীর সকল আবদার মিটানো ও তার কাজ। তারপর ও রাহেলারা দমে যায় না। জীবন তাদেরকে কি চ্যালেঞ্জ দিবে, যেন তারাই ক্ষনে ক্ষনে জীবনকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে চলে। তারা সব পারে।
৮ টা বাজার ৫ মিনিট আগে রাহেলা ফ্যাক্টরিতে উপস্থিত হয়েছিল। কাক ডাকার ঘটনা ছাড়া ও আরেকটা ঘটনা রাহেলার আরো বেশী মনে পড়তে লাগলো। রান্না করতে করতে দেরী হয়ে যাওয়ায় রাহেলা তড়িঘড়ি করেই কাজে রওয়ানা দিয়েছিল। ঘর থেকে বের হতে যাবে এমন সময় তার ছোট্ট আদরের বাবুটা পেছন থেকে ডেকে বললো আম্মু, আজকে আমাকে খাইয়ে দিয়ে যাও। প্রত্যেকদিন আমার একা একা খেতে ভালো লাগেনাএই কথা শুনে রাহেলার মাতৃহৃদয় হাহাকার করে উঠেছিল। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার সন্তানকে খাইয়ে তারপর কাজে যাবে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে পড়লো এই মাসে এমনিতেই ২ দিন লেট আছে, আজকে লেট করলে ইনচারজকে জবাব দেওয়ার মুখ থাকবে না। তাই ছেলেকে আদর করে একটা চুমু দিয়ে বললো, বাবা এইবেলা একটু কষ্ট করে খেয়ে নাও। আমি অফিস থেকে এসে তোমাকে তোমার প্রিয় মাছের ডিম ভাজী দিয়ে খাইয়ে দিবো। ছেলেটা মন খারাপ করেছিলো।
আসার পথে বার বার রাহেলার এই কথাই মনে পড়তে লাগলো। অন্যমনস্ক থাকায় একবার রাস্তায় রিক্সার সাথে ধাক্কা খেয়েছিলো। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছে না হলে পায়ের উপর দিয়ে রিক্সার চাকা চলে যেতো।
অফিসে গিয়ে নিজের মেশিনে বসতেই পাশের টেবিলের অবিবাহিত সালমা খোঁচা দিয়ে বলতে লাগলো, কি ব্যাপার সই, চোখ লাল কেন? মতিন ভাই কি সারারাত ঘুমাতে দেয় না?  এটা বলেই সে গাঁ দুলিয়ে হাসতে লাগলো। এই রসিকতাগুলো এরা প্রায়ই করে। মাঝে মাঝে আরো বিশ্রী রসিকতা ও করে। যেমন দুদিন আগেই সালমা রাহেলাকে বললো তোমাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করবো, বলতে পারলে সিঙ্গারা খাওয়াবো। ধাঁধাটা শুধুমাত্র মেয়েদের ক্ষেত্রেই খাটে। এমন একটা জিনিস যেটা প্রথমবার লাগাতে খুব কষ্ট হয় কিন্তু পরেরবার থেকে লাগালে খুব আনন্দ হয়। কি সেটা?
ধাঁধা শুনেই রাহেলা লাল হয়ে গেলো। রাহেলার অবস্থা দেখে সালমা অবশ্য উত্তরটা বলে দিয়েছিল। সেটা ছিলো কানের দুল।
মাঝেমধ্যে তাদের ঝগড়া ও হয়, তখন একজন আরেকজনকে খুব খারাপ ভাষায় গালাগালি ও করে। কিন্তু তারপরে তারা যেই একটা পরিবারের মত। প্রত্যেকের জীবনেই কোন কোন কষ্ট আছেই, তবু তারা আনন্দ নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। দেশকে নিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির দিকে।
লাঞ্চ আওয়ারের ৩০ মিনিট আগে রাহেলা ওয়াশরুমে গেছে। তার দুমিনিটের মধ্যেই ফ্যাক্টরিতে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। ঘটনার সূত্রপাত রাহেলার ফ্লোরেইকমপ্লিট হওয়া গার্মেন্টসগুলো যেদিকে রাখা হয়েছিল, সেদিকের একটা লাইনে সর্ট সার্কিট হয়ে আগুন ধরে যায়। প্রথমে কেউই খেয়াল করেনি, আগুন যখন পুরোপুরি লেগে যায় তখন সবার নজরে আসে। আগুন দেখেই সবাই দোড়াদোড়ি শুরু করে দেয়। ফ্যাক্টরিতে যখন ফায়ার এলারম বাজতে শুরু করলো তখন আগুন প্রায় অর্ধেক ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই একসাথে নামতে গিয়ে অনেক শ্রমিক আহত হয়। পদদলিত হয়ে কয়েকজনের অবস্থা বেশী শোচনীয় হয়ে যায়। ওয়াসরুমে থাকার কারনে রাহেলা এসবের কিছুই জানতো না। ফায়ার এলারম শুনে ও ওয়াশরুম থেকে বের হতে গিয়ে দেখলো সামনে ভয়াবহ আগুন। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হঠাৎ আগুন দেখে রাহেলা অজ্ঞান হয়ে জায়গায় পরে গেলো। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে প্রায় ২ ঘন্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছিলো। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর যখন ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ভিতরে চেক করতে গেলো, তখন তারা একটি দগ্ধ লাশ পেলো। লাশটি ছিলো হতভাগী রাহেলার।


তার সন্তানটি তখন ও জানতো না যে তার মা আর নেই। সে অপেক্ষায় আছে কখন তার মা আসবে, কখন মাছের ডিম দিয়ে ভাত খাইয়ে দিবে। L      



Post a Comment

There is very tragedy ful story.on the other hand awareness for our garments workers.Go ahead dada & I extremely waiting for next surprise

Dear readers, after reading the Content please ask for advice and to provide constructive feedback Please Write Relevant Comment with Polite Language.Your comments inspired me to continue blogging. Your opinion much more valuable to me. Thank you.