Image

Image

0
www.janaricca.blogspot.com

ইবনে সিনার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা সমুহ ...।
বিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। আর এই চিকিৎসা বিজ্ঞানে একজন বিজ্ঞানী বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাঁর লেখা চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থ “আল কানুন ফিল থিব” কে দীর্ঘকাল ইউরোপে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত করা হতো। মানবদেহের অঙ্গসংস্থান ও শরীরতত্ত্ব সন্বন্ধে তিনি যে সব তথ্য প্রদান করেছিলেন সেগুলো সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশের চিকিৎসকেরা অনুসরণ করেছিলেন। বলা যায়, শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁর কালজয়ী অবদান উল্লেখযোগ্য। এই খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হচ্ছেন আবুল আলি ইবনে সিনা। তিনি ইবনে সিনা নামে অধিক পরিচিত।
নাম- আবুল আলি ইবনে সিনা।
জন্ম-আনুমানিক ৯৮০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে এবং মৃত্যু-১০ ডিসেম্বর ১০৩৭।
বাসস্থান- উজবেকিস্তানের বিখ্যাত শহর বোখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে।
শৈশবে ইবনে সিনা
-------------------
অবাক করা ঘটনা, মাত্র দশ বছর বয়সেই ইবনে সিনা পবিত্র কোরআন শরীফ মুখস্ত করতে সক্ষম হন। ইবনে সিনা লাইব্রেরীতে পড়ার সুযোগ পেয়ে রীতিমত অধ্যয়ন শুরু করলেন এবং লাইব্রেরীর সব বই মুখস্থ করে ফেললেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিত, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কাব্য ও সাহিত্য বিষয়ে অসামান্য পান্ডিত্য অর্জন করেন। ২১ বছর বয়সে তিনি আল মুজমুয়া নামে একটি বিশ্ব কোষ রচনা করেন। এতে তিনি গণিত ছাড়া সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেন।
ইবনে সিনার শিক্ষা জীবন
-------------------------
শৈশবে তিনজন গৃহ শিক্ষকের নিকট তিনি ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ্‌, তাফসীর, গণিত শাস্ত্র, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র এবং এমনকি জ্যামিতি বিষয়ে অধ্যায়ন শুরু করেন। এভাবে তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে সেসময় প্রচলিত সকল জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছিলেন। বলা হয়ে থাকে ইবনে সিনা সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, ইউক্লিডের জ্যামিতি, এরিস্টটলের দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বীজগণিতে বুৎপত্তি লাভ করেন। মূলত কিডোর ইচ্ছায় তাঁকে আইন শাস্ত্রে অধ্যায়ন শেষে আঠার বছর বয়সে গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। এতে তাঁর যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া দর্শন শাস্ত্রেও তিনি অধ্যায়ন করেন। তখনকার দিনে তিনি ‘হাকিম’ অর্থাৎ প্রজ্ঞাবান উপাধিতে ভূষিত হন।
ইবনে সিনার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা
----------------------------------------------
বুখারার সুলতান মাহমুদ এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বহু নামকরা চিকিৎসক আসেন তাঁকে চিকিৎসা করতে। কেউ পারলেন না তাঁর রোগ নির্ণয় করতে। এ মুহূর্তে তরুণ ইবনে সিনা সেচ্ছায় রাজ দরবারে গিয়ে রাজার চিকিৎসার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। সহসাই তিনি অনুমতি পেলেন। ইবনে সিনার চিকিৎসার গুণে অতি অল্পদিনের মধ্যে সুলতান আরোগ্য লাভ করলেন। সুলতানও তাঁর প্রতি খুশী হলেন এবং চাইলেন তাঁকে পুরস্কৃত করতে। এ সময় ইবনে সিনা সুলতানের প্রিয় এক বিরাট গ্রন্থাগারে এসে পড়াশোনা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। বরং সুলতান তাঁর উপর সমগ্র গ্রন্থাগারের ভার অর্পণ করলেন।
হঠাৎ একদিন এই গ্রন্থাগারে আগুন লেগে সমস্ত বই নষ্ট হয়ে যায়। বিরোধীরা সুলতানের নিকট প্রকাশ করলেন এটি ইবনে সিনার কাজ। তারা বললেন, ইবনে সিনা বইগুলো কন্ঠস্থ করে নিয়ে ইচ্ছে করেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। কানপাতলা সুলতান এ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করলেন। এবং ইবনে সিনাকে বিতাড়িত করলেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজাগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহশীল হয়ে উঠেছিলেন। আর এসব রাজ্যের রাজাগণ চাইতেন রাজসভায় বড় বড় পণ্ডিত রাখতে। ইবনে সিনার তেমন অসুবিধা হলো না। তিনি বুখারা পরিত্যাগ করে খরজমে গেলে সেখানকার সুলতান তাঁকে রাজচিকিৎসক নিয়োগ করলেন।
খরজমের রাজসভায় বহু গণ্য-মান্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলবেরুনী যিনি সুলতান মাহমুদের সঙ্গে ভারতবর্ষে এসেছিলেন এবং তৎকালীন ভারতের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। একদিন সুলতান মাহমুদের কর্ণগোচর হয় ইবনে সিনা, আলবেরুনী প্রভৃতি পণ্ডিতের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি। তিনি খরজমের সুলতানের কাছে তাঁরই সভায় প্রেরণের দাবী করলেন। আর মাহমুদের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারলেন না খরজমের শাসক। তিনি পণ্ডিতদের সেখানে প্রেরণ করলেন। কিন্তু ইবনে সিনা কেমন যেন ঘৃণাবোধ করায় সুকৌশলে নিজেকে মুক্ত করে পালিয়ে গেলেন।
কিছুদিন অগোচরে থাকার পর ইবনে সিনা একদিন উপস্থিত হলেন ইরানের রাজসভায়। সুলতান তাঁর পূর্ণ পরিচয় পেয়ে খুব আনন্দিত হলেন। সেই সঙ্গে তাঁকে সভাপণ্ডিতে পদ দান করলেন। এদিকে সুলতান মাহমুদ এত সহজে হার মানার পাত্র ছিলেন না। গুপ্তচরের মুখে সংবাদ পেয়ে ইবনে সিনাকে বেঁধে আনার নির্দেশ দিলেন।
এবারও ইবনে সিনা পালিয়ে গেলেন হামদানে। সেখানে তিনি প্রধান উজিরের পদ লাভ করলেন। এখানে তিনি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে দিনাতিপাত করলেন। কিন্তু এখানে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। এক বিদেশীর আধিপত্য দেখে রাজপুরুষেরা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। এই পর্যায়ে ইবনে সিনা বিরক্ত হয়ে উজিরের পদ পরিত্যাগ করে চলে গেলেন ইস্পাহানে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দিলেন। অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করলেন। সমসাময়িককালে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও রাজনীতিজ্ঞ।
ইবনে সিনার সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনীঃ
---------------------------------------
ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসামান্য মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্ত করে ফেলেন। তার ৩ জন গৃহ শিক্ষক ছিলেন। তাদের মধ্যে ইসমাইল সূফী তাকে শিক্ষা দিতেন ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ শাস্ত্র আর তাফসীর; মাহমুদ মসসাহ শিক্ষা দিতেন গণিত শাস্ত্র এবং বিখ্যাত দার্শনিক আল না' তেলী শিক্ষা দিতেন দর্শন, ন্যয় শাস্ত্র, জ্যামিতি, টলেমির আল মাজেস্ট, জওয়াহেরে মান্তেক প্রভৃতি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে স্কল জ্ঞান তিনি লাভ করে ফেলেন। বিখ্যাত দার্শনিক আল না' তেলীর নিকট এমন কোন জ্ঞান আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তিনি ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে পারবেন। এরপর তিনি ইবনে সিনাকে নিজে স্বাধীন মত গবেষণা করার কথা বলেন। এসময় সম্বন্ধে ইবনে সিনা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন:
''যে কোন সমস্যার সমাধান ওস্তাদ যেরুপ করতেন আমি তার চেয়ে ভালভাবে করতে পারতাম। তারঁ কাছে জাওয়াহির মানতিক বা তর্কশাস্ত্রের খনি নামক বইটি পড়ে মুখস্থ করার পর বুঝলাম, আমাকে শেখাবার মত কিছু নতুন আর তার কাছে নেই। তখন বইগুলো আর একবার পড়তে শুরু করলাম। ফলে সকল বিষয়ে আমি বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠলাম। ইউক্লিডের জ্যামিতির (দ্য এলিমেন্ট্‌স) প্রথম কয়েকটি সম্পাদ্যের সমাধানে ওস্তাদের সাহায্য নিয়ে বাকি কটির সমাধান আমি নিজেই করলাম। টলেমির ১৩ খণ্ডের আলমাজেস্ট বইটি শুরু করে সমস্যার সম্মুখীন হলে ওস্তাদ বললেন, "তুমি নিজে সমাধান করতে চেষ্টা কর, যা ফল দাড়ায় এনে আমাকে দেখাও। আমি বিচার করে রায় দেবো।" একে একে সব সমস্যার সমাধান করে ওস্তাদের সম্মুখে হাজির করলাম। তিনি দেখে-শুনে বললেন, "ঠিক হয়েছে, সব কটিই নির্ভুল সমাধান হয়েছে।" আমি বেশ বুঝতে পারলাম, এ ব্যাপারে ওস্তাদ আমার কাছ থেকে কিছু নতুন তথ্য শিখে নিলেন।''
এভাবে না' তেলী বুঝতে পারলেন তার প্রয়োজন শেষ। এরপর তিনি বুখারা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বুআলী নিজেই এবার নিজের শিক্ষক সাজলেন। এসময় চিকিৎসা শাস্ত্র এবং স্রষ্টাতত্ত্ব সম্বন্ধে তার মৌলিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটে। এরিস্টটলের দর্শন সম্পূর্ণ ধাতস্থ করেন এ সময়েই। নতুন বই না পেয়ে আগের বইগুলোই আবার পড়তে লাগলেন। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা তার কাছে পড়তে আসত, তরুণ বয়সেই তিনি এবার শিক্ষকতা শুরু করলেন।
এবার তিনি চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত কিতাব সংগ্রহ করে গবেষণা করতে শুরু করেন । ইবনে সিনা তার আত্নজীবনীতে লিখেছেন যে, এমন বহু দিনরাত্রী অতিবাহিত হয়েছে যার মধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্য ও ঘুমাননি। কেবল মাত্র জ্ঞান সাধনার মধ্যেই ছিল তার মনোনিবেশ। যদি কখনো কোন বিষয় তিনি বুঝতে না পারতেন কিংবা জটিল কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি মসজিদে দিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন এবং সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে বলতেন, ''হে আল্লাহ আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও। জ্ঞান লাভ ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর কোন কামনা নেই।'' তারপর গৃহে এসে আবার গবেষণা শুরু করত। ক্লান্তিতে যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো স্বপ্নের ন্যায় তার মনের মধ্যে ভাসত এবং জ্ঞানের দরজা যেন খুলে যেত। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠেই সমস্যা গুলোর সমাধান পেয়ে যেতেন। এ সময় বুখারার বাদশাহ নুহ বিন মনসুর এক দুরারোগ্য ব্যাধীতে আক্রান্ত হন। দেশ এবং বিদেশের সকল চিকিৎসক এর চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়। ততদিনে সীনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায়, বাদশাহের দরবারে তার ডাক পড়ে। তিনি বাদশাহকে সম্পূর্ণ সাড়িয়ে তুলেন। তার খ্যাতি এ সময় দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আরোগ্য লাভের পর বাদশাহ সীনাকে পুরস্কার দেয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। এসময় সীনা চাইলে বিপুল সম্পদ ও উচ্চপদ লাভ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কেবল বাদশাহ্‌র কাছে শাহী কুতুবখানায় (বাদশাহ্‌র দরবারের গ্রন্থাগার) প্রবেশ করে পড়াশোনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। বাদশাহ তার এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। এভাবেই ইবন সিনা শাহী গ্রন্থাগারে প্রবেশের সুযোগ পান। গ্রন্থাগারের ভিতরে যেয়ে অবাক হয়েছিলেন সিনা। কারণ এমন সব বইয়ের সন্ধান তিনি সেখানে পেয়েছিলেন যেগুলো এর আগেও কোনদিন দেখেননি এবং এর পরেও কখনও দেখেননি। প্রাচীন থেকে শুরু করে সকল লেখকদের বইয়ের অমূল্য ভাণ্ডার ছিল এই গ্রন্থাগার। সব লেখকের নাম তাদের রচনাসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা তৈরির পর তিনি সেগুলো অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। এমনই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন যে, নাওয়া-খাওয়ার কথা তার মনেই থাকত না। মাত্র অল্প কয়েকদিনে তিনি অসীম ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে কুতুবখানার সব কিতাব মুখস্ত করে ফেলেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন বিষয় ছিল না যা তিনি জানতেন না। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, খোদতত্ত্ব, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। ২১ বছর বয়সে 'আল মজমুয়া' নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন, যার মধ্যে গণিত শাস্ত্র ব্যতীত প্রায় সকল বিষয়াদি লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
এবং ১০০৪ খ্রিস্টাব্দে ইবনে সিনা খাওয়ারিজমে রাজনৈতিক আশ্র্য় গ্রহণ করেন। এ সময়ে খাওয়ারিজমের বাদশাহ ছিলেন মামুন বিন মাহমুদ। সেখানে তিনি পণ্ডিত আল বেরুনির সাথে সাক্ষাৎ করেন। আল বেরুনির মূল উৎসাহ ছিল ভারতবর্ষ। কিন্তু ইবন সিনা কখনও ভারত অভিমুখে আসেননি। তিনি যাত্রা করেছিলেন পশ্চিম দিকে। তার মূল উৎসাহও ছিল পশ্চিমের দিকে। এ কারণেই হয়তো তার চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত বইগুলো প্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে পাশ্চাত্য জগতেও আপন অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল। স্বাধীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন সিনা। ১০০৪-১০১০ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি খাওয়ারিজমে শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করলেও তার এ সুখ শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইবনে সিনার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে গজনীর সুলতান মাহমুদ তাকে পেতে চাইলেন। কারণ মাহমুদ জ্ঞানী ব্যাক্তিদের খুব ভালবাসতেন। তাদেরকে দেশ বিদেশ থেকে ডেকে এনে তিনি তার শাহী দরবারে গৌরব বৃদ্ধি করতেন এবং তাদেরকে মণি মুক্তা উপহার দিতেন। এ উদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ তার প্রধান শিল্পী আবু নসরের মাধ্যমে ইবনে সিনার ৪০ খানা প্রতিকৃতি তৈরি করে সমগ্র সিনাকে খুঁজে বের করার জন্য দেশে বিদেশ সুলতান মাহমুদ লোক পাঠিয়ে দিলেন। এছাড়া তিনি খাওয়ারিজমের বাদশাহ মামুন বিন মাহমুদকে পরোক্ষভাবে এ নির্দেশ দিয়ে একটি পত্র পাঠালেন যে তিনি যেন তার দরবারের জ্ঞানী ব্যাক্তিদের সুলতান মাহমুদের দরবারে পাঠিয়ে দেন। আসলে অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে ইবনে সিনাকে পাওয়াই ছিল তার আসল উদ্দেশ্য।
ইবনে সিনা পদার্থ বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান , সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় শতাধিক কিতাব রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে আল কানুন, আশ শেফা, আরযুযা ফিত তিব্ব, লিসানুল আরব, আলমজনু, আল মুবাদাউন মায়াদা, আল মুখতাসারুল আওসাত, আল আরসাদুল কলিয়া উল্লেখযোগ্য। আল কানুন কিতাবটি তৎকালীন যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে দিয়েছিল। কারণ এত বিশাল গ্রন্থ সে যুগে অন্য কেউ রচনা করতে পারেননি। তার গ্রন্থ আল কানুন চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠ্য পুস্তক হিসেবে গন্য হত প্রায় পাচ শতক ধরে । আল কানুন কিতাবটি ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষায় অনুদিত হয় এবং তৎকালীন ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয় গুলোতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আল কানুন ৫টি বিশাল খণ্ডে বিভক্ত যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪ লক্ষাধিক। কিতাবটিতে শতাধিক জটিল রোগের কারণ, লক্ষণ, পথ্যাদির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়। তিনি ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের প্রভূত উন্নয়ন করেন। তবে তার মূল অবদান ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রে। তিনি হলিস্টিক মেডিসিনের প্রণেতা। যেখানে একই সাথে শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক যোগসূত্রকে বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। তিনি মানুষের চোখের সঠিক এনাটমি বর্ণনা করেন। যক্ষ্মা রোগ নিয়ে তিনি অভিমত দেন যে যক্ষ্মা একটি ছোয়াচে রোগ। যা তার পরের পশ্চিমা চিকিৎসকবৃন্দ প্রত্যাখ্যান করেন এবং যা আরো পরে সঠিক বলে প্রমানিত হয়। তিনিই প্রথম মেনিনজাইটিস রোগটি সনাক্ত করেন। প্রকৃত পক্ষে তিনিই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক। আশ শেফা দর্শন শাস্ত্রের আরেকটি অমূল্য গ্রন্থ, যা ২০ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। এতে ইবনে সিনা রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রানীতত্ত্ব ও উদ্ভিদতত্ত্ব সহ যাবতীয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি মানুষের কল্যাণ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনে আজীবন পরিশ্রম করেছেন এবং ভ্রমণ করেছেন জ্ঞানের সন্ধানে। পানি ও ভূমির মাধ্যেমে যে সকল রোগ ছড়ায় তা তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। সময় ও গতির সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের কথা তিনিই আবিষ্কার করেন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন ভালভাবে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু অ্যারিস্টটলের কিছু কিছু মতবাদের সাথে তিনি একমত হলেও সকল মতবাদের সাথে তিনি একমত হতে পারেননি।
ইস্পাহানে বেশ কিছুকাল তিনি শান্তিতে দিনাতিপাত করেন। হামাদানের কেউ তাকে এসময় বিরক্ত করত না। কিন্তু এখানেও বেশিদিন শান্তিতে থাকতে পারেননি সিনা। অচিরেই হামাদান এবং ইস্পাহাসের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ইসপাহানের সম্রাট হমাদানের বিরুদ্ধে অভিযান প্রস্তুত করেন। এসময় সম্রাট ইবন সিনাকে সাথে নেয়ার ইচ্ছ প্রকাশ করেন। চিকিৎসা সেবা প্রদানের কারণেই তাকে নেয়ার ব্যাপারে সম্রাট মনস্থির করেন। নিজে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও সম্রাটের অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেতে পারেননি। ইস্পাহানের সৈন্যবাহিনীর নাথে হামাদানের পথে রওয়ানা করেন। হামাদানের সাথে সিনার অনেক স্মুতি জড়িত ছিল। আর এখানে এসেই তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার এই অসুখ আর সারেনি। হামাদানের যুদ্ধ শিবিরে অবস্থানকালে ইবন সিনা ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে (৪২৮ হিজরী) মৃত্যুবরণ করেন। হামাদানে তাকে সমাহিত করা হয়।

Post a Comment

Dear readers, after reading the Content please ask for advice and to provide constructive feedback Please Write Relevant Comment with Polite Language.Your comments inspired me to continue blogging. Your opinion much more valuable to me. Thank you.